মে দিবসকে বলা হয় শ্রমিকদের দিবস। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের দিবস। ১৮৮৬ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে জীবন দিয়েছিলেন। সেই আত্মদানের পথ ধরেই ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে শিকাগোর রক্তঝরা দিনটিকে শ্রমিক দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়, যা পরবর্তী সময়ে ‘মে দিবস’ নামে পালিত হচ্ছে।
কিন্তু যে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকেরা মে দিবস প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেখানে মে দিবস পালিত হয় না। সেখানে শ্রমিকদের দিবস হলো সেপ্টেম্বরের প্রথম সোমবার। আবার সৌদি আরবসহ অনেক দেশে মে দিবস পালনও করতে দেওয়া হয় না।
২০১৮ সালে যখন মে দিবস পালিত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে শ্রমিকশ্রেণি তথা শ্রমজীবী মানুষের সার্বিক অবস্থা ভালো বলা যাবে না। তাঁদের চাকরি ও বেতন-ভাতার নিশ্চয়তা নেই। সরকারি কারখানাগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অথচ এসব কারখানা বন্ধের জন্য শ্রমিকেরা মোটেই দায়ী নন। দায়ী হলো সরকারের ভুল নীতি, অব্যবস্থা ও দুর্নীতি। প্রথম আলো অফিসের কাছেই বিজিএমইএর ভবন। আসা-যাওয়ার পথে প্রায়ই দেখি, কোনো না কোনো কারখানার শ্রমিকেরা বকেয়া বেতন পাওয়ার জন্য সেখানে ধরনা দিচ্ছেন। শ্রমিকেরা হয়তো প্রতিদিনের মতো কাজে গিয়ে দেখছেন ফটক তালাবদ্ধ। অনিবার্য কারণে কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। সেই কারখানায় এমন কাউকে পাওয়া যায় না, যিনি কেন বন্ধ, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। মালিককে বাড়িতে গিয়েও হয়তো পাওয়া গেল না। শ্রমিকেরা নিরুপায় হয়ে তৈরি পোশাক মালিক সমিতির সদর দপ্তরে আসেন প্রতিকারের জন্য। সমিতি অনেক সময় মালিককে বলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা আদায়ের ব্যবস্থা করে। আবার অনেক সময় ধুরন্ধর মালিককে তারাও রাজি করাতে পারে না। তখন বিজিএমইএরও কিছু করার থাকে না। সম্প্রতি সেখানে শ্রমিকদের সঙ্গে বিজিএমইএ কর্মীদের সংঘাত ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। কোনো অফিস বা গাড়ি ভাঙচুর করা সমাধান নয়। কিন্তু ক্ষুধার্ত শ্রমিকদের আপনি কীভাবে বোঝাবেন? তাঁদের তো ঘরে ফিরে যাওয়ারও উপায় নেই। হয়তো ফিরে দেখবেন ভাড়া বকেয়ার জন্য বাড়ির মালিক আসবাবপত্র বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ঘরটি তালাবদ্ধ করে রেখেছেন।
এটি হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও বিকাশমান তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের অবস্থা। অন্যান্য শিল্প খাতের শ্রমিকদের অবস্থা আরও করুন। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব মালিকই শ্রমিকদের ঠকান। কোনো কোনো মালিক আইনানুযায়ী শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেন। তাঁদের কারখানাও ভালো চলে। কোনো শ্রমিক অসন্তোষ নেই।
১৮৮৬ সালে শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কাজের অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করে জীবন দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর ঘোষণাও আট ঘণ্টা কর্মদিবসের কথা আছে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক মালিকই সেটি মানেন না। শ্রমিকদের দিয়ে বেশি সময় কাজ করান। আবার ন্যূনতম মজুরিও দেন না। আনুষ্ঠানিক খাতে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নির্ধারিত থাকলেও অনানুষ্ঠানিক খাতে সেটি মানা হয় না। বিশেষ করে পরিবহন ও হোটেলশ্রমিকদের দৈনিক ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। তাঁদের ছুটিছাঁটাও নেই। বাংলাদেশে বর্তমানে আনুষ্ঠানিক খাতের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি এবং তাঁরা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
এবারে বাংলাদেশে মে দিবসের প্রতিপাদ্য হলো: ‘মালিক শ্রমিক ভাই ভাই সোনার বাংলা গড়তে চাই’। কিন্তু মালিকেরা যদি ক্রমাগত শ্রমিকদের ঠকাতেই থাকেন, তাহলে তাঁরা কী করে ভাইয়ের ভূমিকা নেবেন? তাজরীনের মতো অনেক কারখানা মালিক শ্রমিকদের পাওনা না দিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছেন। মালিকের কারণে কারখানায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটলেও শতাধিক শ্রমিককে জীবন দিতে হয়েছে। আরও কয়েক শ আহত হয়ে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন।
আগে মে দিবসে শ্রমিক সংগঠনগুলো বড় বড় সমাবেশ করে সরকার ও মালিকপক্ষকে জানিয়ে দিত, তাদের ন্যায্য মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। কিন্তু এখন আর বড় সমাবেশ হয় না। রাজনৈতিক দলগুলোও আর শ্রমিক ও কৃষকের অধিকার নিয়ে ভাবে না। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এই শ্রমিক ও কৃষকই।
কিছুদিন আগে মহারাষ্ট্রের কৃষকেরা লাল ঝান্ডা নিয়ে মুম্বাই শহরে অবস্থান নিয়েছিলেন। হাজার হাজার কৃষক। তাঁদের আন্দোলনের মুখে রাজ্য সরকার দাবি মানতে বাধ্য হয়েছে। দাবি আদায় করেই তাঁরা ঘরে ফিরেছেন। বাংলাদেশের শ্রমিক ও কৃষকদের আওয়াজও এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে হবে, যাতে সরকার ও মালিকেরা দাবি মানতে বাধ্য হন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির তিন নায়ক শ্রমিক, কৃষক ও প্রবাসী শ্রমিক। তাঁদের শ্রম-ঘামেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের সিঁড়িতে পা রেখেছে। নিজেরা বঞ্চিত থেকে তাঁরাই আমাদের আহার জোগাচ্ছেন। আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করছেন।
মে দিবসে বাংলাদেশের এই তিন নায়ককে অভিনন্দন।
